ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য সকালের নাস্তা কতটা জরুরি?

0
56

যারা সকালের নাস্তা ছাড়া দিন শুরুর কথা ভাবতেই পারেন না। অনেকেই আবার নানা অজুহাতে নাস্তা বাদ দেন। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, সকালের নাস্তা বেশি পরিমাণে ক্যালরি পোড়াতে সাহায্য করে এবং সারাদিন রক্তে শর্করার পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তাই প্রতিদিন সকালে স্বাস্থ্যকর এবং ভারী নাস্তা খেলে মস্তিষ্ক পুরোদিনের জন্য তৈরি হয়ে যায় এবং সারাদিন শক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, এ কথা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য কি না? চলুন এবার জেনে নেওয়া এ সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন।

ডায়েবেটিস রোগীরা কী নাস্তা করবেন: যে সকালে নাস্তা করে, সে তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে – এ কথায় নিশ্চিয়ই অবাক হচ্ছেন? আসলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। ব্রিটিশ বায়োকেমিস্ট টেরেন্স কেলি এমনটাই জানাচ্ছেন। তাঁর মতে, সকালে নাস্তা খাওয়ার পরই রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়, তাই নাস্তা না করাই ভালো। বলা বাহুল্য, কেলি একজন ডায়েবেটিস রোগী। অর্থাৎ তিনি বলতে চেয়েছেন যাঁরা ডায়াবেটিক বা যাঁদের ডায়াবেটিস আছে, তাদের সকালে নাস্তা না করা ভালো।

অন্যদিকে আরেকদল বিশেষজ্ঞ ডায়াবেটিস রোগীদের সকালের নাস্তা একেবারেই পরিহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলেছেন, যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের অনেকেই সকালের নাস্তা খেতে চান না অথবা অপরিকল্পিতভাবে সকালের নাস্তা সেরে ফেলেন। এক্ষেত্রে তাদের অভিমত হচ্ছে, যদি আপনার ব্লাড সুগার হাই থাকে তাহলেও সকালের নাস্তা পরিহার করা ঠিক নয়।

গবেষকরা বলেছেন, ব্রেকফাস্ট পরিহার করলে ডায়াবেটিস রোগীদের শরীরের ওজন বেড়ে যেতে পারে এবং পাশাপাশি ইনসুলিনও রেজিস্ট্যান্স হতে পারে। তারা আরও বলেছেন, ব্রেকফাস্ট ইটার্সদের লাঞ্চ-ডিনারে ফ্যাট ও হাই ক্যালরি ডায়েট আহার করলেও বেটার রেজিস্ট্যান্স হয়। পাশাপাশি প্রতিদিন একই সময়ে ব্রেকফাস্ট করা উচিত। যাতে সারাদিনের ব্লাড সুগার একই রকমের থাকে।

এক্ষেত্রে রিডার্স ডাইজেস্ট অবলম্বনে ডায়াবেটিস রোগীদের সকালের নাস্তা আহারের নানা পরামর্শ এখানে তুলে ধরা হলো-

সকালের নাস্তায় রাখতে হবে স্বাস্থ্য: সম্মত কার্বোহাইড্রেট। যেমন: ওট মিল, সিরিয়াল, ব্রেড ইত্যাদি। বাসাতেই ব্রেকফাস্ট আহারের অভ্যাস করতে হবে। ব্রেকফাস্টে রাখতে হবে অন্তত: এক হাজার কিলো ক্যালরির মতো খাদ্য শক্তি। খাবার তালিকায় রাখতে পারেন শর্করা, ফ্যাট, চিজ, সসেজ মাফিন, ওটমিল, ফ্যাট ফ্রি মিল্ক ইত্যাদি। হোল গ্রেইন সিরিয়াল, আধাকাপ ফ্রেস ফ্রুইট, যেমন: স্ট্রবেরী, ব্লু বেরী ইত্যাদি। খাদ্য তালিকায় রাখতে পারেন সিরিয়াল ও ইয়োগার্ট।

সাধারণ কর্ন ফ্লেক্স-এর চেয়ে ওটমিল ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য ভালো। যারা ওটমিল আহার করেন তাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি ৩৯ ভাগ কম। ব্রেকফাস্টে রাখতে পারেন লোফ্যাট মিল্প অথবা সুগার ফ্রি ইয়োগার্ট। অরেঞ্জ জুস না খেয়ে ফ্রেশ অরেঞ্জ খাওয়া ভালো। চা-কফি পানের সময় চিনি পরিহার করুন এবং সিনামন যোগ করতে পারেন।

স্বাস্থ্যকর নাস্তা কোনগুলো: সকালের নাস্তায় শর্করা, আঁশ, সামান্য প্রোটিন, ফ্যাট এবং অল্প ফল থাকলে সবচেয়ে ভালো। অর্থাৎ মানুষের একদিনে যা ক্যালোরির প্রয়োজন তার শতকরা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ সকালের নাস্তায় থাকলেই যথেষ্ট। স্বাস্থ্যসম্মত সকালের নাস্তা হচ্ছে – দুধ বা দইয়ের সঙ্গে মচমচে কর্নফ্লেকস, বিভিন্ন বিচি, অর্থাৎ সূর্যমুখী ফুলের বিচি, মিষ্টি কুমড়োর বিচি, কাঠ বাদাম, তিসি, তিল ও তার সঙ্গে তাজা ফল। ভিটামিন, মিনারেল ও আঁশসহ এই নাস্তা যেমন পেট ভরাবে, তেমনি সুস্থও রাখবে। অথচ দেখবেন ওজনটা বাড়বে না।

যারা ওজন কমাতে চান: ওজন কমাতে চাইলে অনেকেই সকালে নাস্তা করেন না। ফলে দেখা যায় যে, দুপুরে তাদের প্রচণ্ড খিদে পায়। তখন তারা পরিমাণে অনেক বেশি খেয়ে ফেলেন। এতে স্লিম তো দূরের কথা ওজন আরও বাড়ে। তবে যারা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য জার্মানির খাদ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়োহানেস অ্যার্ডমানের পরামর্শ অনেকটা বায়োকেমিস্ট টেরেন্স কেলির মতো। অর্থাৎ তার কথায়, ওজন কমাতে চাই, সকালে নাস্তা না করলেও হবে। তবে দুপুরে হালকা খাবার খেতেই হবে। এছাড়া ওজন কমাতে আগ্রহীদের প্রধান খাবারগুলোর মাঝখানে টুকিটাকি খাবার, বিশেষ করে ‘জাঙ্ক ফুড’ বাদ দিতে হবে।

সকালে কি মিষ্টি খান: শরীরে শক্তি যোগায় বলে অনেকেই সকালে মিষ্টি খেতে পছন্দ করেন। আসলে মিষ্টি খেলে শরীরে শক্তি বাড়ে ঠিকই, তবে কিন্তু তা কিছুক্ষণের জন্য। তাই শরীরে শক্তি পেতে মিষ্টির বিকল্প হিসেবে সাদা দইয়ের সঙ্গে খনিকটা তাজা ফল খেতে পারেন। আর মিষ্টি প্রেমীরা মন খারাপ না করে বরং মিষ্টিটা সপ্তাহান্তে পরিবারের সকলের সঙ্গে খাবেন। তাহলে দেখবেন শর্করা বা ওজন বাড়ার সমস্যায় পড়তে হবে না।

অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: প্রতিটি মানুষ যেমন আলাদা, তেমনি তাদের পেট বা অন্ত্রও আলাদা। অর্থাৎ একজনের শরীরের জন্য যে খাবার অত্যন্ত জরুরি, সে খাবার অন্যের শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অথবা দেখা দিতে পারে মারাত্মক অ্যালার্জি। তাই মনে রাখতে হবে যে, সব খাবার সবার জন্য নয়।

যে দেশের যে নিয়ম: গরম দেশে সকালের নাস্তা হয় এক রকম, আবার শীতের দেশের মানুষ অন্যরকম খাবার খান। তাই খাবারের ব্যাপারে আবহাওয়া, বয়স, দেশ, পরিবেশ, স্বাস্থ্যের অবস্থা ইত্যাদিও মাথায় রাখতে হবে। তা সে সকালের নাস্তা হোক বা অন্যান্য বেলার খাবার।

কফি বা চা: যদি কেউ সকালে নাস্তা না করেই ভালো বোধ করেন কিংবা শুধু কফি বা চা-ই যদি তার জন্য যথেষ্ট হয়, তাহলে তার আর জোর করে নাস্তা খাওয়ার তেমন প্রয়োজন নেই, জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞ ইয়োহানেস অ্যার্ডমান।

বাড়ন্ত বয়সে নাস্তা: বাড়ন্ত বয়সের শিশুদের ক্ষেত্রে সকালের নাস্তার বিষয়টি আলাদা। পেট একেবারে খালি রাখলে বা কিছু না খেলে স্কুলে বা লেখাপড়ায় শিশুদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটে। সেক্ষেত্রে শিশুদের শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী সকালের নাস্তা নির্বাচন করা উচিত। তবে যে শিশু স্কুলে যাওয়ার আগে দুধ খেতে চায় না, তাকে জোর না করাই ভালো।