ব্যায়াম ছাড়াও ওজন কমানোর কিছু সহজ উপায়: পুষ্টিবিদ সোনিয়া শরমিন খান

0
141

বর্তমানে প্রায় সবাই ওজন নিয়ন্ত্রনের বিষয়ে সতর্ক। তবে ভুল পদ্ধতি অবলম্বনের কারণে অনেকেই ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। স্থূলতার কারণে আমাদের বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা যায়। পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবনে বিভিন্ন স্ট্রেসের কারনে শরীরে স্থুলতা সৃষ্টি হতে পারে। সুস্থ কর্মকাণ্ড বা পরিশ্রম না করার কারণে আমাদের বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যায় পড়তে হয় যার মধ্যে ওজনাধিক্য অন্যতম। একটু সচেতন হলে ব্যায়াম ছাড়াও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা যায় বলে মনে করেন মোহাম্মদপুরে অবস্থিত সিটি হেলথ সার্ভিসেস লিমিটেডের নিউট্রিশনিস্ট ও ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান সোনিয়া শরমিন খান।সম্প্রতি তিনি ওজন নিয়ন্ত্রনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সাক্ষাকার দিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইনকে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন একুশে টিভি অনলাইন প্রতিবেদক তবিবুর রহমান।

প্রশ্ন: ওজন নিয়ন্ত্রণে করণীয় কী ?
সোনিয়া শরমিন খান: ওজন কমানোর সহজ উপায় হলো নিময় মেনে নির্দিষ্ট সময়ে প্রতিদিন পরিমিত পরিমান খাবার গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনের চাইতে বেশি খাবার খেলে বাড়তি খাবারকেই আপনার শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় মনে হবে। তবে শরীরে আসলে কতটুকু খাবার প্রয়োজন তা নির্ণয় করতে খাবারের পুষ্টিমাণ এবং ক্যালরির চাহিদা সম্পর্কে জানতে হবে। পুষ্টি বহুল প্রয়োজনীয় আদর্শ খাবারের পরিমাণ নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ কোন খাবারে কি পরিমান পুষ্টি উপাদান আছে এবং দেহের চাহিদার আদর্শ পরিমান অর্থাৎ “আমার কতটুকু খেতে হবে” বিষয়টা জানতে পারলেই প্রতিদিন বেশি খাবার গ্রহণ থেকে মুক্তি মিলবে। একজন মানুষকে ৬ বেলা খেতে হবে যার মধ্যে প্রধান খাবার তিন বার হবে, তবে তা অবশ্যই পরিমান মতো। কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ শুধুই তিন বেলা খাবার খায় এবং বেশি বেশি করে খায়। এই অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। মোটকথা বয়স, উচ্চতা, ওজন ও পরিশ্রম ভেদে ক্যালরির চাহিদা অনুযায়ী খাবার গ্রহণ করতে হবে।

প্রশ্ন: অনেকেই বলে বেশি পানি পান করা শরীরের জন্য ভাল আপনি কি মনে করে?
সোনিয়া শরমিন খান: বেশি বেশি পানি পান করলে শরীর সুস্থ থাকবে এমন ধারণা ঠিক নয়, সুস্থ থাকার জন্য আপনাকে পরিমান মতো পানি পান করতে হবে। একজন মানুষের প্রতি কেজি ওজনের জন্য ০.০৩ লিটার পানির প্রয়োজন। দেহের ওজনের সাথে ০.০৩ গুন করলেই একজন ব্যাক্তি তার দেহের পানি বা তরলের চাহিদা সম্পর্কে জানতে পারবে। তাই অবশ্যই পর্যাপ্ত পরিমাণ পানি পান করতে হবে। খাওয়ার ১০ থেকে ১৫ মিনিট আগে পানি খেয়ে নিন। খাওয়ার পর কমপক্ষে ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর পানি খাবেন। এতে খাবারের শোষণ ও বিপাক কাজ ভাল হবে এবং শরীর সুস্থ্য থাকবে।

প্রশ্ন: সুস্থ থাকার জন্য দিনে কতবার খাওয়া উচিত ?
সোনিয়া শরমিন খান: দৈনন্দিন কাজকর্ম ও চলাফেলা করার জন্য সবল, রোগমুক্ত ও সুস্থ শরীর প্রয়োজন। আর এই সুস্থ শরীর বজায় রাখতে খাবার প্রয়োজন। খাবার শরীর গঠন, বৃদ্ধি সাধন এবং ক্ষয়পূরণ করে; তাপশক্তি ও কর্মক্ষমতা বাড়ানোর সাথে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। দিনে ৬ বার খাবার খেতে হবে যার মধ্যে ৩ বার প্রধান খাবার হবে। কোন বেলার খাবার বাদ বা ত্যাগ করা বা দেরিতে গ্রহণ করা যাবেনা। সময় নিয়ে, চিবিয়ে খাবার খেতে হবে। খাওয়ার সময় টেলিভিশন বা কম্পিউটারে সিনেমা দেখা লোভনীয় হলেও ক্ষতিকর। কারণ, হয়ত আপনি বেশি বা কম খেয়ে ফেলতে পারেন। ফলে নিজের ক্যালরির চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় খাবারের আদর্শ পরিমাণে তারতম্য ঘটবে।

প্রশ্ন: ওজনাধিক্যের সঙ্গে শুধুই খাদ্যের সম্পর্ক আছে কি ?
সোনিয়া শরমিন খান: ওজনাধিক্যের সঙ্গে খাদ্যের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। অন্য কোনো কারণ যদি থাকেও তবুও ওজন বেড়ে যাওয়ার মূল কারণই বেশি বা কম খাবার গ্রহন। যদি বেশি খাওয়া হয় তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পুষ্টি উপাদান দেহে চর্বি বা মেদ হয়ে ওজনাধিক্যের সৃষ্টি করে, আবার কম খেলে পর্যাপ্ত পুষ্টি উপাদানের অভাবে দেহে হরমোনের ইমব্যালেন্স এর কারণে ওজনাধিক্যের সৃষ্টি হয়। শরীরের সুস্থতা বজায় রাখার জন্য সুষম খাবার পরিমাণ মত খাওয়া প্রয়োজন, এটা যেমন সত্য আবার অন্যদিকে প্রয়োজনের বেশি বা কম খেলে শরীরে ওজনাধিক্য বা অন্য কোন শারীরিক অসুস্থতা হতে পারে এটাও সত্য।

প্রশ্ন: দেহের প্রয়োজনীয় ক্যালরি কীভাবে পেতে পারি ?
সোনিয়া শরমিন খান: ক্যালরির হিসাব টা একটু অন্য রকম। দেহের ওজন,উচ্চতা,বয়স এবং শারিরীক পরিশ্রমের উপর ভিত্তি করে এটা নির্ধারণ করা হয়। শুধু তাই নয়, এটাও জানা দরকার,কোন পুষ্টি উপাদান থেকে কত পরিমান ক্যালরি প্রয়োজন। যেমন, একজন মধ্যম উচ্চতার পুর্ন বয়স্ক পুরুষের সারাদিনের ক্যালরির চাহিদা যদি ২০০০ ক্যালরি হয়, তবে এর ২০% থেকে ৩৫% হবে ফ্যাট জাতীয় খাবার থেকে। সেই অর্থে ফ্যাট জাতীয় খাবার এর ক্যালরির পরিমান হবে ৪০০ থেকে ৭০০ ক্যালরি পর্যন্ত। গ্রামে হিসাব করলে পরিমান টি দাঁড়ায় ৪৪ গ্রাম থেকে ৭৭ গ্রাম পর্যন্ত। যেমন, ৫ গ্রাম বা ১ টে.চামচ তেল/ বাটার/ মার্জারিন এ আমরা পাই ৪৫ ক্যালরি। ঠিক তেমনই একটি সাদা রুটি বা ১ কাপ (১২০মি.লি.) সাদা ভাত এ আমরা পাই ৩০ গ্রাম থেকে ৪৫ গ্রাম পর্যন্ত কার্বোহাইড্রেট যা থেকে আসবে ১১০ থেকে ১২০ ক্যালরি। আবার যেমন,এক টুকরো মুরগীর মাংসে (১০০ গ্রাম) আমরা পাই ২৪ গ্রাম থেকে ২৯ গ্রাম প্রোটিন যার ক্যালরি মান ৯৬ থেকে ১১৬ ক্যালরি। এই হিসাব টা একজন সাধারণ মানুষের জন্য একটু ঝামেলার। তাই, সবারই উচিত পরিমিত পরিমানে খাদ্যের সব (৬ টি) উপাদান এর সামঞ্জস্যতা রেখে একটি সঠিক খাদ্যাভ্যাস বা ব্যালেন্স ডায়েট গ্রহণ করা অথবা নিকটস্থ একজন পুষ্টিবিদের সাহায্যে নিজের ক্যালরির চাহিদা অনুযায়ী একটি খাদ্যতালিকা বা ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা।