নবী (সা.) এর আদর্শে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্ব

0
37

স্বামী-স্ত্রীর পারিবারিক জীবনের গুরুত্ব অনেক। জীবনের এ অংশটি যদি শান্তিময় ও প্রাণবন্ত হয় তাহলে এটা শুধু একটি ঘরের জন্যই উপকারজনক ও স্থিতিকারক নয় বরং স্বামী-স্ত্রী থেকে আগত নব অতিথির শিক্ষা-দীক্ষা ও সুচরিত্রের জন্য উপকারী।
পারিবারিক শৃঙ্খলার স্থায়িত্ব এবং স্থীরতা এর ওপরই নির্ভরশীল। মহান আল্লাহ না করুক, জিন্দেগীর এ অংশটি যদি ভুল বোঝাবুঝি ও অসহযোগিতার শিকার হয় তাহলে জীবনের এ অংশটি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাবে।

যা একদিকে পারিবারিক শৃঙ্খলা বিনষ্ট করবে এবং অন্যদিকে তাদের থেকে আগত ভবিষ্যত প্রজন্ম এমন নারকীয় পরিবেশে সঠিক শিক্ষা ও তারবিয়ত থেকে বঞ্চিত হবে। যার ফলে সে চারিত্রিক ব্যবহার ও কর্মদক্ষতার ব্যপারে একেবারেই লাগামহীন হয়ে যাবে এবং পারিবারিক সম্পর্কের বন্ধন স্থবির হয়ে যাবে।

বিয়ে এক ধারাবাহিক সম্পর্কের নাম:

নবী (সা.) এর পবিত্র জীবনাদর্শ হলো সমগ্র মানবজাতির জন্য পথ চলার আলোকবর্তিকা ও পাথেয়। জীবনের প্রতিটি বাঁকে বাঁকে এ পবিত্র জীবনাদর্শ মানুষকে রাস্তা দেখায় এবং জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন দিকগুলোকে নিজ আলোয় আলোময় করে দেয়।

এ জিনিস তখনই আসবে যখন স্বামী-স্ত্রী একের হক অপরজন পরিপূর্ণভাবে আদায় করবে এবং আনন্দঘন ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়বে। হ্যাঁ, অনস্বীকার্য বাস্তবতা এটা যে, এ সম্পর্কের স্থায়ীত্ব ও স্থিরতার জন্য স্বামীর অসাধারণ কর্ম দক্ষতা থাকা চাই।

আর পবিত্র শরিয়ত তার হাতেই বিয়ের লাগাম দিয়েছেন। এ জন্য একজন স্বামী তার স্ত্রীর সঙ্গে কি ধরণের আচরণ ও সম্পর্ক করবে তা নবী (সা.) এর পবিত্র জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা নেয়া ও তা নিজ জীবনে বাস্তবায়ন করা খুবই প্রয়োজন। নিচে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর দায়িত্বপূর্ণ কিছু বিষয় তুলে ধরা হলো।

স্ত্রীর কাজ কর্মে সহযোগিতা:

নবী (সা.) এর কাধে নবুয়তের গুরু দায়িত্বের কারণে নবী (সা.) এর ঘরোয়া ও বাহিরের জীবন খুবই ব্যস্তময় ছিল। কিন্তু তা সত্তেও নবী (সা.) এর সুন্নাত এ ছিলো যে, যখন তিনি ঘরে আসতেন তখন আটার খামির বানাতেন, অথবা ঘরের অন্যান্য প্রয়োজন পূরণ করতেন।

হজরত আয়েশা (রা.)-কে নবী (সা.) এর ঘরোয়া কাজ কর্মের কথা জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, তিনি মাথা থেকে উকুন বের করতেন, বকরীর দুধ দুহন করতেন, নিজের কাপড় সেলাই করতেন, নিজের কাজ নিজেই করতেন, নিজের জুতা সেলাই করতেন এবং সেসব কাজ করতেন যা অন্যান্য পুরুষগণ নিজ ঘরে করে থাকে। নবী (সা.) ঘরোয়া কাজ-কর্মে লেগে থাকতেন, নামাজের সময় হলে তা ছেড়ে চলে যেতেন। (মুসনাদে আহমদ)

নবী (সা.) এর কর্মপন্থা এক সফল ও সুখময় জীবনের বুনিয়াদ। এটা ঠিক যে পুরুষ ও মহিলার কাজ-কর্ম বণ্টনকৃত। পুরুষ বাহিরের কাজকর্ম ও মহিলা গৃহস্থলি কাজ কর্মের দেখভাল করবে। তা সত্তেও স্বামীর নৈতিক দায়িত্ব হলো, স্ত্রীর কাজকর্মে হাত লাগানো ও ঘরোয়া বিষয়াদিতে পরামর্শ করা।

স্ত্রীর মতামতকে সম্মান করা:

নবী (সা.) এর পারিবারিক জীবনের এক দৃষ্টান্ত এ ছিল যে, তিনি নিজ পবিত্র স্ত্রীগণের মতামতকে সম্মান করতেন। হোদায়বিয়া সন্ধির সময় যখন নবী (সা.) প্রায় পনের শ’ সাহাবীকে সঙ্গে নিয়ে ওমরা করার জন্য গেলেন, তখন কাফেররা এতে বাধা প্রধান করে। তখন নবী (সা.) নিজ দূরদর্শীতায় কাফেরদের সঙ্গে বাহ্যিকভাবে সন্ধি করেন।

সন্ধিনামা লেখার পর নবী (সা.) সাহাবাদের বলেন, উঠো! নিজ পশুগুলো কোরবানি করে দাও। কিন্তু তিন বার বলার পরও সাহাবারা উঠলেন না (যা মূলত ছিল স্বভাবগত প্রচন্ড আবেগ ও রাগের কারণে তারা তা মেনে নিতে পারছিলেন না) তখন নবী (সা.) উম্মে সালমা (রা.) এর নিকট গেলেন এবং সাহাবাদের অবস্থা আলোচনা করলেন। তখন তিনি নবী (সা.)-কে বললেন, আপনি তাদের কিছু বলবেন না, আপনি উঠে নিজ উট কোরবানি করুন, নিজ মাথা মুন্ডিয়ে ফেলুন।

নবী (সা.) তার কথামত কোরবানি ও হলক করলেন। তা দেখে সাহাবাগণও (রা.) কোরবানি ও হলক করলেন। এতে শিক্ষণীয় যে, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদিতে নারীদেরও মতামত নেয়া চাই এবং রায় পছন্দ হলে এর ওপর আমল করা উচিত।

ঘরের মানুষদের দ্বীনদারীর প্রতি লক্ষ্য রাখা:

নবী (সা.) এর পরিবারিক জীবনের অসাধারণ ও অনুস্বরনীয় দিক এ ছিলো যে, তিনি নিজ ঘরের লোকদের দ্বীনদারীর ফিকির করতেন এবং তাদের দ্বীনদার বানানোর ফিকির করতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবী (সা.) এর অভ্যাস ছিল, যখনই ঘরে আসতেন সুউচ্চ আওয়াজে এ কথাগুলো বার বার বলতেন যে, যদি আদম সন্তানের নিকট দুটি ময়দান ভর্তি সম্পদ থাকে তবুও সে তৃতীয় আরেক ময়দানের লালসায় থাকে। শুধু মাত্র কবরের মাটিই তাকে পরিতৃপ্ত করতে পারে (শো’বুল ইমান)

নবী (সা.) এর কথাগুলো বারবার বলার কারণ হলো, যাতে দুনিয়ার ক্ষনস্থায়ীত্ব ও অসারতা আহলে বাইতদের অন্তরে বসে যায়।

কিন্তু আজ দেখা যায় মানুষের নামাজ, তিলাওয়াত, নফলের পাবন্দীর অবস্থা! তাদের ঘরে দ্বীনী পরিবেশ নেই। ফরজ ওয়াজীব এর ব্যাপারে গাফলতি তো দিন দিন বেড়েই চলছে। অতএব নবী (সা.) এর পবিত্র সিরাত থেকে আমাদের শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। এর মাধ্যমে নিজেদের ঘরোয়া লোকদের দ্বীনদার বানানো ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।

ইসলামি শিক্ষা প্রদান করা:

পবিত্র কোরআন বলেছে, ‘হে ইমানদারগণ! তোমরা নিজেকে এবং তোমার পরিবার পরিজনকে দোজখের আগুন থেকে বাঁচাও।’ ( সূরা: আত্ তাহরীম, আয়াত: ৬)

দোজখের আগুন থেকে বাঁচার পথ তো পরিবারের সদস্যদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেয়া এবং সে অনুসারে আল্লাহর দ্বীন পালনে অভ্যস্ত করে গড়ে তোলা। স্ত্রী ও সন্তানদের ইলমে দ্বীন শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে অনেক হাদিস বর্তমান। সাহাবি মালেক ইবনে হুয়াইসির (রা.) বলেন, ‘আমরা কয়েকজন যুবক দ্বীন সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য নবী (সা.) এর কাছে বিশ দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। যে সময় তিনি উপলব্ধি করলেন আমরা বাড়ি ফেরার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছি তখন বললেন, নিজের স্ত্রী পুত্রের কাছে ফিরে যাও এবং সেখানে অবস্থান করো। তাদেরকে দ্বীন সম্পর্কে শিক্ষা দাও এবং তা মেনে চলতে নির্দেশ দাও।’ ( বোখারী, কিতাবুল আযান)

স্ত্রীর প্রতি আর্থিক দায়িত্ব পালন:

স্ত্রীর রয়েছে স্বামীর প্রতি অর্থনৈতিক অধিকার। অর্থনৈতিক অধিকারের প্রথম স্তরে রয়েছে মোহর লাভের অধিকার। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহর নির্দেশ ‘তোমরা তোমাদের স্ত্রীদেরকে মনের সন্তোষ সহকারে তাদের মোহর প্রদান কর।’ ( সূরা: নেসা, আয়াত: ৪)

এ ছাড়া পরিবারে স্ত্রী ও অন্যান্য সদস্যদের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা স্বামীর দায়িত্ব। এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর তাদেরকে ( স্ত্রীদেরকে) খোর পোষ প্রদান করো, সচ্ছল ব্যক্তি তার সাধ্যানুযায়ী এবং অভাবগ্রস্ত ব্যক্তি তার সাধ্যানুযায়ী ন্যায় সংগতভাবে কিছু খরচপত্রের ব্যবস্থা করে, এ হলো মোহসেনদের দায়িত্ব।’ (সূরা: আল বাকারা, আয়াত: ২৩৬) এ ব্যাপারে অল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, ‘তোমাদের ওপর স্ত্রীদের অধিকার হলো তাদের জন্য পোশাক পরিচ্ছদ ও খাদ্য দ্রব্যের উত্তম ব্যবস্থা করা।’ (তিরমিজি: ১১০১)

কিন্তু বর্তমান সমাজে তাতো করেই না বরং অনেক অর্বাচীন স্বামী ও তার মা বাবারা বিয়ের আগেই স্ত্রীর বাবা-মার কাছ থেকে যৌতুক আদায় করে থাকে। তারা ভুলে যায় স্ত্রীরও মর্যাদা আছে। সে সংসারে ক্রীতদাস হয়ে আসেনি। যতক্ষণ টাকা থাকে ততক্ষণ তার দাম থাকে। এই শরিয়ত বিরোধী আচরণের কারণে সংসারে অশান্তি লেগে থাকে। এগুলো থেকেও মুসলিম সমাজকে বিরত থাকতে হবে। স্ত্রীর সঙ্গে মহব্বতের বহিপ্রকাশ:

স্ত্রীর নিকট মহব্বতের প্রকাশ দাম্পত্য সম্পর্ক জোরদারের জন্য এক অসাধারণ কর্মপ্রয়োগ। নবী (সা.) সময়ে সময়ে পবিত্র স্ত্রীগণের নিকট ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাতেন। আয়েশ (রা.) বলেন, একদা আমি পানি পান করছিলাম। এ সময় নবী (সা.) এসে বললেন, আমার জন্য পানি বাঁচিয়ে রাখ। আমি পানি অবশিষ্ট রাখলাম। তিনি নিকটে আসলেন, জিজ্ঞেস করলেন কোন দিকে ঠোঁট লাগিয়ে পান করেছ? আমি বলার পর সে স্থানে ঠোঁট মোবারক লাগিয়ে পান করলেন। (নাসাঈ)।

অন্য বর্ণনায় আয়েশা (রা.) বলেন, আমি মাসিক অবস্থায় হাড্ডি চুষতেছিলাম তখন নবী (সা.) আমার চুষার স্থান থেকে হাড্ডি চুষলেন। (মুসনাদে আবু ইয়ালা)

স্ত্রীর নিকটাত্নীয়দের প্রতি খেয়াল রাখা:

প্রত্যেক স্ত্রীর অন্তর চায় যে, তার স্বামী তার আত্নীয়-স্বজনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার ও ভালো সম্পর্ক রাখুক। হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, হজরত খাদিজা (রা.) এর ওপর আমার গায়রত আসে এ জন্য যে, নবী (সা.) তাকে অনেক স্মরণ করতেন। কখনো কখনো বকরী জবাই করে এটার গোশত খাদিজা (রা.) এর বান্ধবীদের নিকট পাঠাতেন। (বুখারী)

এতে শিক্ষণীয় যে, স্ত্রীর আত্নীয়দের সঙ্গে কল্যাণকামী ও ভালো সম্পর্ক রাখা চাই। তাদের জন্য কখনো কখনো হাদিয়া তোহফাও দেয়া উচিত।