ধ্বংসাত্মক ৯ জেলায় ৭ নম্বর বিপদ সংকেত

0
435

৭ নম্বর বিপদ সংকেত- ব্যাপক ধ্বংসাত্মক শক্তি নিয়ে উড়িষ্যা উপকূলের দিকে ধেয়ে যাচ্ছে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় ফনি। ঘণ্টায় ১৭০ কিলোমিটার বাতাসের শক্তি হাজার কিলোমিটার ব্যাসের বিস্তার নিয়ে এ ঝড় শুক্রবার দুপুর নাগাদ উড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করতে পারে।

ভারতীয় আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাসে এমনটিই বলা হয়েছে। আর যদি উত্তরমুখী গতিপথ ধরে রাখে, তবে কিছুটা দুর্বল হয়ে শনিবার সকালে বাংলাদেশের সীমানায় হানা দিতে পারে ফনি।

বাংলাদেশের মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে সাত নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

যে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ফনির তাণ্ডবের শঙ্কা, সেখানে ১০ কোটির বেশি মানুষ বাস করেন। এতে আসন্ন দুর্যোগ মোবাবেলায় বুধবার থেকেই বিপুল প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে দুই প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশ।

ইতিমধ্যে ভারতীয় রাজ্য উড়িষ্যা ও অন্ধ্রপ্রদেশের বেশ কিছু জেলায় সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এ দুই রাজ্য ছাড়াও বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোতে চার ও সাত নম্বর হুশিয়ারি সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের আবহাওয়া অধিদফতরের খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে পশ্চিম মধ্য বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন এলাকায় অবস্থানরত অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফনি সামান্য উত্তর-উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে একই এলাকায় অবস্থান করছে।

এটি বৃহস্পাতিবার সকাল ৯টায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ১০৬৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ১০২৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯১৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৯২৫ কিমি দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থান করছিল।

এটি আরও ঘণীভূত ও উত্তর/উত্তরপূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে শুক্রবার বিকাল নাগাদ ভারতের উড়িষ্যা উপকূল অতিক্রম করতে পারে এবং পরবর্তীতে উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলে হয়ে শুক্রবার মে সন্ধ্যা নাগাদ খুলনা ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এলাকায় পৌঁছাতে পারে।

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক বলেন, খুলনা ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় শুক্রবার সকাল নাগাদ অতি প্রবল ঘূর্ণিঝড় ফনি এর অগ্রবর্তী অংশের প্রভাব শুরু হতে পারে।

‘ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৭৪ কিমির মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ১৬০ কিমি, যা দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়ার আকারে ১৮০ কিমি পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটে সাগর খুবই বিক্ষুব্ধ রয়েছে।’

তিনি বলেন, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে চার নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে সাত নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে।

‘উপকূলীয় জেলা ভোলা, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহ সাত নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।’

আবহাওয়া অধিদফতর জানায়, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরকে চার নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত নামিয়ে তার পরিবর্তে ছয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতেহ ছয় নম্বর বিপদ সংকেতের আওতায় থাকবে।

কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরকে চার নম্বর স্থানীয় হুশিয়ারি সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

ঘূর্ণিঝড় ও অমাবস্যার প্রভাবে উপকূলীয় জেলা চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, ভোলা, পটুয়াখালী, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরসমূহের নিম্নাঞ্চল স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৪-৫ ফুট অধিক উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হতে পারে।

ঘূর্ণিঝড় অতিক্রমকালে চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, ফেনী, চাঁদপুর, বরগুনা, পটুয়াখালী, বরিশাল, ভোলা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা জেলা এবং তাদের অদূরবর্তী দ্বীপ ও চরগুলোতে ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণসহ ঘণ্টায় ৯০-১১০ কিমি বেগে দমকা অথবা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও গভীর সাগরে অবস্থানরত সকল মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে অতিসত্বর নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হয়েছে এবং পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে বলা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে রেড অ্যালার্ট-৩ জারি, পণ্য ওঠানামা বন্ধ

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ফণীর’র আঘাতের আশঙ্কায় চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ১৬টি বড় জাহাজ সরিয়ে গভীর সমুদ্রে পাঠানো হয়েছে। বন্দরে রেড অ্যালার্ট-৩ জারি করা হয়েছে। সব ধরনের অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে চট্টগ্রাম সুমদ্রবন্দরে।

বন্দরের জেটি ও বর্হিনোঙ্গরের জাহাজ থেকে পণ্য ওঠানামা বন্ধ রয়েছে। বাতিল করা হয়েছে বন্দরসহ চট্টগ্রামের জেলা ও উপজেলার সকল কর্মকর্তা-কর্মচারী ও নার্সদেও ছুটি।

আবহাওয়া অধিদফতর চট্টগ্রাম বন্দরকে ৬ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, আবহাওয়া অধিদফতরের সতর্ক সংকেতের ওপর নির্ভর করে চট্টগ্রাম বন্দরের অপারেশন ধাপে ধাপে বন্ধ করা হয়।

সর্বশেষ চট্টগ্রাম বন্দরকে ৬ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। সেই অনুযায়ী বন্দর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছে-যোগ করেন বন্দরের পরিচালক।

এদিকে, কর্ণফুলী থেকে কোনো লাইটারেজ জাহাজও বঙ্গোপসাগরে বর্হিনোঙ্গরে যাচ্ছে না। ঝুঁকি এড়াতে বন্দরের জেটি থেকে সব জাহাজকে বর্হিনোঙ্গরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

জেটিতে ক্রেনসহ কনটেইনার ও পণ্য ওঠানামায় ব্যবহৃত সরঞ্জাম শক্তভাবে বেঁধে রাখার নির্দেশনা দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব ওমর ফারুক জানিয়েছেন, আবহাওয়া বিভাগের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরে ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারির পর বন্দরের নিজস্ব অ্যালার্ট-থ্রি জারি করা হয়েছে।

বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর ও বর্হিনোঙ্গর মিলিয়ে বৃহস্পতিবার (২ মে) সকালে মোট জাহাজ ছিল ১৬৮টি। এর মধ্যে পণ্যবোঝাই জাহাজ ছিল ৮০টি।

আবার এর মধ্যে ১৬টি জাহাজ জেটিতে পণ্য খালাসের জন্য নোঙ্গর করা ছিল। বাকি ৬৪টি জাহাজ ছিল বর্হিনোঙ্গরে। ৬ নম্বর বিপদসংকেত জারির পর জেটি থেকে ১৬টি জাহাজকে সরানো হচ্ছে।

জেটি জাহাজশূন্য করার পাশাপাশি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন, শোর ক্রেন, আরটিজি, স্ট্র্যাডেল ক্যারিয়ারসহ সব ধরনের কনটেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং ইক্যুইপমেন্ট বুম আপ করে অ্যাংকর করার প্রস্তুতি চলছে।

ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলে যাতে আমদানি-রফতানি পণ্যভর্তি কনটেইনারের ক্ষয়ক্ষতি না হয় সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

নগরীর পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাগর এই মুহূর্তে খুবই উত্তাল আছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজারসহ উপকূলবর্তী ১৪টি জেলার চরসংলগ্ন সাগরে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় ৪ থেকে ৫ ‍ফুট উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস সৃষ্টি হতে পারে। এতে জেলাগুলো প্লাবিত হতে পারে।