একজন মুসলমানের মধ্যে যে ১২টি বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার

0
145

মুসলমানরা বিশ্বাস করে, সূরা আল ইসরা (বনি ইসরাইল) শবে মিরাজের ঘটনার পর মক্কায় মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতীর্ণ হয়েছিল।

এই সূরায় আল্লাহতায়ালা মুসলমানদের কয়েকটি মৌলিক অঙ্গীকারের উল্লেখ করেছেন। এই অঙ্গীকারগুলো পূরণ না করে কোনো ব্যক্তি বা দল সফল হতে পারে না। এসব মূল্যবোধের ভিত্তিতে মুসলমানদের জীবনযাপন করতে হয়। আর তাদের মানব জাতিকে এই মূলনীতিগুলোর দিকে আহ্বান জানানো উচিত।

এসব মূলনীতি কেবল বিশেষ একটি গোত্র বা দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরিধি ও প্রয়োগের দিক দিয়ে বিশ্বজনীন। এগুলো ‘হিকমাহ’ নামেও অভিহিত, যার অর্থ প্রজ্ঞাপূর্ণ শিক্ষা। যথাযথভাবে অনুসরণ করা হলে এই মূলনীতিগুলো সব মানুষের কল্যাণ ও প্রজ্ঞা বৃদ্ধি করতে সক্ষম। এগুলো হচ্ছে-

শুধু আল্লাহর ইবাদত

‘তোমার প্রভু আদেশ করেছেন, তোমরা তাঁর ব্যতীত আর কারো বন্দেগী বা ইবাদত করবে না (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৩)। এর অর্থ, পরম বাস্তবতা এবং একক উপাস্যরূপে আল্লাহতায়ালার স্বীকৃতি প্রদান, সম্পূর্ণ নিষ্ঠাসহকারে তাঁর ইবাদত করা এবং জীবনের প্রতিটি বিষয়ে তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ। একজন মুসলিমের জীবন আল্লাহর প্রতি পরিপূর্ণ অঙ্গীকারে আবদ্ধ হওয়া ছাড়া কিছু নয়।

আমরা কেবল একত্ববাদীই নই; সেই অদ্বিতীয় স্রষ্টাকেন্দ্রিক জীবন আমাদের। তিনিই আমাদের সার্বক্ষণিক ও চূড়ান্ত ভাবনার বিষয়।

মাতাপিতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও দয়ালু হওয়া

‘আর (যাতে তোমরা দেখাও) মাতাপিতার প্রতি দয়া। যদি তাদের একজন কিংবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হন, তাদের ব্যাপারে ‘উহ’ পর্যন্ত বলো না, অথবা তাদের ধমক দিও না; বরং তাদের সাথে শিষ্টাচারপূর্ণভাবে কথা বলো। তাদের প্রতি ভালোবাসার সাথে, অত্যন্ত নম্র ও বিনয়ী আচরণ করো; এবং বলো, হে পালনকর্তা তাদের উভয়ের প্রতি দয়া করো, যেমন তারা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৩-২৪)।

সন্তানের জন্য মাতাপিতার দয়া ও দরদের স্বীকৃতি, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং তাদের ভালোবাসার প্রতিদানে যথাসাধ্য করার জন্যই এটা।

মাতাপিতার প্রতি সন্তানের ভক্তি হলো মুসলমানদের দ্বিতীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও দয়া আমাদের জন্য নিছক সামাজিক দায়িত্ব নয়। এটা আমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতাও বটে।

আত্মীয়, দরিদ্র ও মুসাফিরের প্রতি সদয় হওয়া

আত্মীয়স্বজনকে তাদের প্রাপ্য দাও, আর অভাবী ও মুসাফিরকে তাদের প্রাপ্য (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৬)।

মনে রাখা দরকার, এই পৃথিবীতে আমরা পরস্পর সম্পর্কিত। আমাদের দায়িত্ব কেবল নিজের প্রতি নয়, কিংবা শুধু পরিবারের প্রতিও নয়। অন্যান্য আত্মীয় এবং বৃহত্তর পর্যায়ে, সমাজের প্রতিও আমাদের কর্তব্য রয়েছে।

আমরা একে অপরের মুখাপেক্ষী এবং এই জীবনপথে আমরা সবাই সহযাত্রী। অন্যের জন্য আমরা কী করতে পারি, সেদিকে অবশ্যই আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। মুসলমানদের জীবন অবশ্যই সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল হতে হবে। এই দায়িত্বের সূচনা হয় পরিবারে এবং অন্যান্য আত্মীয়ের ক্ষেত্রে। যারা অভাবগ্রস্ত, যাদের প্রয়োজন সাহায্য, এমন সবার প্রতি দায়িত্ব রয়েছে।

অর্থের ব্যাপারে সতর্কতা এবং সম্পদের অপচয় না করা

আর (তোমার সম্পদ) অপচয় করো না। দেখো, অপচয়কারীরা সর্বদাই শয়তানের ভাই আর সে বরাবরই তার প্রভুর প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।… তুমি একেবারে কৃপণ হয়োও না এবং হয়োও না একেবারে মুক্তহস্তও। তাহলে তুমি তিরস্কৃত, নিঃস্ব হয়ে পড়বে। নিশ্চয়ই তোমার পালনকর্তা বা প্রভু যাকে ইচ্ছা দান করেন অধিক জীবনোপকরণ; আর তিনিই তা সঙ্কুচিতও করে দেন। তিনিই তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবগত- তিনি দেখছেন সবকিছু (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ২৬-২৭, ২৯-৩০)।

অর্থের ব্যাপারে কেউ কৃপণ বা অপচয়ী, কোনোটাই হওয়া উচিত নয়। অপচয় করা অনুচিত; আবার কৃপণও হওয়া ঠিক নয়। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপনে মুসলমান অঙ্গীকারবদ্ধ।

হালাল পন্থায় উপার্জন করা চাই। আর সে অর্থ সঠিকভাবেই ব্যয় করা উচিত। আল্লাহতায়ালা আমাদের যত সম্পদ দিয়েছেন, তার সব ক্ষেত্রেই এই মূলনীতি প্রয়োগ করা সম্ভব। দূরদর্শিতার সাথে এবং বিবেকসম্মত উপায়ে সম্পদের সদ্ব্যবহার মুসলমানদের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি।

সন্তানের যত্ন নেয়া

‘তোমাদের সন্তানদের হত্যা করো না, দারিদ্র্যের ভয়ে; আমরা তাদের এবং তোমাদের আমিই জীবনোপকরণ দিই। দেখো, তাদের হত্যা করা মহাপাপ’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩১)।

আমরা যেহেতু মাতাপিতার অধিকারের স্বীকৃতি দিচ্ছি, সন্তানের অধিকারও স্বীকার করে নেয়া উচিত। আমাদের সন্তান আমাদের ভবিষ্যৎ। আমাদের অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে, যাতে আমরা সন্তানদের স্বাস্থ্যবান, বুদ্ধিমান এবং নৈতিক দায়িত্বসচেতন হিসেবে গড়ে তুলতে পারি। তাদের নিরাপদ ও সুস্থ পরিবেশে লালন করার ব্যাপারে আমাদের অঙ্গীকার থাকা দরকার। তাদের জীবনের পাশাপাশি চেতনা, মানসিকতা, নৈতিকতা ও সদাচরণও রক্ষা করতে হবে।

ব্যভিচার ও অবৈধ সম্পর্ক থেকে মুক্ত থাকা

আর অবৈধ যৌন সম্পর্কের নিকটবর্তী হয়ো না। দেখো, এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত ৩২)।